অসমের ইতিহাসের গর্ব লাচিত বরফুকন, যিনি সরাইঘাট যুদ্ধে মোগলদের পরাজিত করে অসমের স্বাধীনতা রক্ষা করেন। জানুন তাঁর বীরত্বগাথা ও ইতিহাস।
লাচিত বরফুকন এর জীবনী | লাচিত বরফুকন এর বিষয়ে বাংলা রচনা
বিশ্বের ইতিহাসের পাতা খুঁজলে বহু সভ্যতার উত্থান পতনের পরিচয় পাওয়া যাবে। তবে একমাত্র ভারতীয় সভ্যতার নানান প্রতিকূলতা এবং ক্ষয়ক্ষতির সাথে আজও হিমালয় পর্বতের মত দাঁড়িয়ে আছে।
তবে আশ্চর্যের বিষয় যে ভারতের বেশিরভাগ ইতিহাস গৌরবময় কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে যা পড়ানো হয় তা সম্পূর্ণ মনগড়া ইতিহাস!
যেকোনো ইতিহাসের ছাত্ৰদের মুঘলদের ইতিহাস জিজ্ঞাসা করলে গড় গড় করে তা বলে দেবে। বাবর। থেকে শুরু করে আকবর ও তাদের চৌদ্দপুরুষের নাম সকলে জানে।
কিন্তু চন্দ্রগুপ্ত, অশোক, রাজা প্রতাপাদিত্য, অজিত সিং ইত্যাদি মহান রাজাদের সম্পর্কে খুব কম মানুষ জানেন। এমনকি ভারতের ছাত্ররা এটা পর্যন্ত জানে না যে কিভাবে ভারতীয় রাজারা মুঘলদের তাড়িয়ে ছিল! এমনি এক মহান হিন্দু যোদ্ধা ছিলেন লাচিত বরফুকন।

যার ইতিহাস বইতে পড়ানো হয় না, তবে লাচিত বরফুকনের ইতিহাস, যুদ্ধ কৌশল ভারতীয় সেনাদের জানানো হয় ও শেখানো হয়। ভারতীয় সেনা ছাড়াও অন্য কিছু দেশেও লাচিত বরফুকানের ইতিহাস পড়ানো হয় শুধুমাত্র তার যুদ্ধ কৌশল শেখানোর জন্য।
অহোম হিন্দু সাম্রাজ্যের সেনাপতি, যে অহোম সাম্রাজ্য ১৭ বার মুঘলদের হারিয়েছিল। ২৪ শে নভেম্বর ১৬২২ সালে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন লাচিত বরফুকান। সাল ১৬৭১ এ মুঘল সেনা অহম সাম্রাজ্যের উপর আক্রমন করেছিল এবং সেই সময় সম্রাজ্যের রক্ষার দায়িত্ব ছিল লাচিত বরফুকনেরহাতে।
লাচিত বরফুকনের সরাইঘাটের যুদ্ধ
লাচিত বরফুকনের এই সরাইঘাটের যুদ্ধের কাহিনী আসল ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে, দালাল ইতিহাসবিদের লেখা ইতিহাস বইতে নেই!
১৬৭১ সালে অহোম হিন্দু সাম্রাজ্য ও মুঘলদের মধ্যে হওয়া ভীষণ যুদ্ধ সরাইঘাটের যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। একদিকে ছিল মুঘলদের বিশাল নৌ বাহিনী, স্থল বাহিনী অন্যদিকে ছিল অহোম সাম্রাজ্যের ছোট আকারের সেনা।
এই ভীষণ যুদ্ধে কট্টর জিহাদি ওরঙ্গজেবের মামা শায়েস্তা খানও মুঘলদের একাংশকে নেতৃত্ব দিত।
মোগলদের বিশাল সৈন্যবাহিনী দেখে পিছু হটতে শুরু করে অহম সৈন্যদলেরা।
কারণ তাদের তুলনায় বহুগুণে ছোট ছিল। অন্যদিকে অসমের রাজধানী গুহাটিতে তারা দখল করে বসে।
মুঘলদের সেনা দেখে লাচিত বরফুকনের সেনা পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। এর পর নিজের সেনার মনোবল বৃদ্ধি করতে সেনাকে উদেশ্য করে বড়ো বক্তৃতা রাখেন লাচিত বরফুকন।

এই হিন্দু মহান যোদ্ধা আরও বলেছিলেন, যদি কারোর পালানোর ইচ্ছা থাকে তাহলে সে অবশ্যই যেতে পারে কারণ আমার শেষ রক্তবিন্দু টুকু শরীরে থাকতে লড়াই করে যাব। তবে কেউ সেনাবাহিনী ছেড়ে গেলে সে যেন কারোর কাছে একথা স্বীকার না করে, যাতে মোঘলরা তাদের দুর্বলতার সুযোগ না পায়।
সেনাবাহিনী দের মধ্যে তিনি এমন তেজ ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যাতে মুঘলরাও হার মেনে যায়। অহম সেনারা দৃঢ়-সংকল্পবদ্ধ হয় যে তাদের মাতৃভূমি এবং মা বোনেদের সম্মান রক্ষা করবে।কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল এই সাম্রাজ্য একবার মুঘলদের হাতে চলে গেলে কখনই তারা হিন্দু নারীর সম্মান রক্ষা করতে পারবে না।

লাচিত বরফুকন তার সেনাকে বুঝিয়ে বলেন যে, যুদ্ধে হারের অর্থ মা, বোনের সম্মান হরণ হওয়া। কারণ মুঘলরা হিন্দু নারীদের সম্মান লুটতে দ্বিধা বোধ করতো না।
লাচিত বরফুকনের ভাষণ শোনার পর অহোম সাম্রাজ্যের ছোটো সেনা যেন জ্বালামুখিতে পরিণত হয়। মুখে হর হর মহাদেব শ্লোগান দিয়ে মাতৃভূমির রক্ষা করতে নেমে পড়ে হিন্দু সেনা।
তিনি সেনাদের মধ্যে এমন জোশ ঢুকিয়ে দেন যে মুঘলদের সামনে ঝুঁকতে অস্বীকার করে তারা। এক এক জন সেনা ১০০ জন মুঘলদের টক্কর দিতে শুরু করে। ওই যুদ্ধের তেজ, বীরত্ব ও ত্যাগের কথা লিখলে পুরো একটা বই লেখা সম্ভব।
বীর হিন্দুদের তান্ডবের কারণে গাজর, মুলার মতো কাটা পড়ে মুঘল সেনা। অহোম হিন্দু সাম্রাজ্যের মাত্র ৪০০০ সেনা মুঘলদের বিশাল সেনার উপর ধ্বংসলীলা চালায়।
চারিদিকে থেকে শোনা যায় হর হর মহাদেব, জয় ভবানী, জয় বজরং বলির শ্লোগান। যুদ্ধে দারুণভাবে পরাজিত হয়ে শেষমেষ পলায়ন করে মুঘলরা।
লাচিত দিবসঃ
আজও সেই বীর হিন্দু যোদ্ধাকে স্মরণ করে পালন হয় বীর লাচিত দিবস।
অবশ্য কিছু মানবিক স্বজাতি এইসব মহাপুরুষদের কথা ভুলে গিয়ে ভ্যালেন্টাইন দিসব, রোজ দিবস পালন করতে ব্যাস্ত, তাদের কাছে বীর লাচিত দিবস একটা গল্প মাত্র।
অন্যদিকে ভারতীয় সেনা ও সচেতন নাগরিকদের কাছে এদিন এক গৌরবের দিন, এক অনুপ্রেরণার দিন।
বর্তমান পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু সম্রাটদের গৌরবময় কাহিনীগুলিবাদ দিয়ে পড়ানো হয় বিদেশী লুণ্ঠনকারী ও কিছু স্বৈরাচারী শাসকদের ইতিহাস। এমনকি লজ্জার বিষয় হলো পাঠ্যপুস্তকে তাদের আতঙ্কবাদী না বলে “সম্রাট” বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

যারা আবার সেই সকল মহান হিন্দু সম্রাটদের বিরুদ্ধে বেইমানি করে হত্যা করেছিল!
এখনো পর্যন্ত সাধারণ মানুষ লাচিত বরফুকনকে চেনা তো দূরের কথা তার নাম পর্যন্ত শোনেনি। কিন্তু আজও এই হিন্দু যোদ্ধাকে ভারতীয় সেনারা সম্মান জানান।
পুনেতে তার একটি স্ট্যাচু রয়েছে যেখানে ভারতীয় সেনাদের ট্রেনিং করানো হয় এবং লাচিত বরফুকানের এর বিষয়ে জানানো হয়, যুদ্ধের কৌশল গুলি বলা হয়।






